এক-সময় শুধু মাদ্রাসাতে কুরআনুল কারিম হিফয করা হত, স্কুলে তার কল্পনা করা ছিল দিবাস্বপ্নের ন্যায়। বর্তমান যদিও সরকারী স্কুল-কলেজের অবস্থা তথৈবচ, তবে প্রাইভেট অনেক স্কুল-কলেজ হয়েছে, যেখানে ফুল টাইম, হাফ টাইম ও খণ্ডকালীন বিভিন্ন পদ্ধতিতে কুরআনুল কারিম হিফয করানো হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলা মাধ্যম, ইংলিশ মিডিয়াম ও ইংরেজি ভার্সন কেউ কারো থেকে পিছিয়ে নেই। এটা পরিচালকদের দীনি চেতনা, দীনকে বিজয়ী করার অভিপ্রায় ও বাতিলকে পরাজিত করার দীপ্ত প্রত্যয়ের বহিঃপ্রকাশ সন্দেহ নেই। আল্লাহ তাদের উদ্দেশ্য সফল করুন। তাদের কেউ হিফয বিভাগ পরিচালনা, হিফয করার পদ্ধতি ও হিফয শাখার আনুষঙ্গিক বিষয়ে সমস্যার সম্মুখীন হোন।
দীনদার অনেক ভাই, সহি আকিদা, দীনের সঠিক বুঝ ও হিদায়েত লাভ করার পর কুরআনুল কারিম হিফয করার মহান ব্রত গ্রহণ করেন, এটা তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত সন্দেহ নেই, কিন্তু হিফয করার সঠিক পদ্ধতি না জানার কারণে কাঙ্ক্ষিত সফলতা থেকে বঞ্চিত হন।
অসংখ্য প্রবীণ মুসলিম, যৌবন থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত সালাত আদায় করছেন মাত্র পাঁচটি কিংবা দশটি সূরা দিয়ে, তাও অশুদ্ধ ও ভুলে ভরা। ষাট বা সত্তর বছরে উন্নীত হয়েছেন কিন্তু কুরআনুল কারিমের কোনো উন্নতি হয়নি, নতুন কোনো সূরা মুখস্থ করার প্রয়োজন অনুভব করেননি, কিংবা তার প্রেরণা পাননি, ফলে দুনিয়া-আখিরাতের প্রচুর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত তিনি।
মাদ্রাসা পড়ুয়া অনেক আলেম আছেন, যারা দশ-বিশটা সূরার বেশী মুখস্থ জানেন না, যদিও দশ বা বারোটা বছর দীন শিক্ষার কেন্দ্র মাদ্রাসায় ব্যয় করেছেন, কিন্তু কুরআন হিফয করার অনুপ্রেরণা কিংবা তার পরিবেশ তিনি পাননি। কতক ইমাম আছেন মাত্র কয়েকটি সূরা দিয়ে জীবন-ভর ইমামত করছেন, একটি সূরা একাধিক সালাতে বারবার পড়ছেন, প্রচুর সময় ও অবসরতা থাকা সত্যেও এক-পারা, দুই-পারা কিংবা তিন-পারা মুখস্থ করার সৌভাগ্য তিনি অর্জন করেননি!
প্রচলিত হিফয খানায় সঠিক নির্দেশনা, উপকারী সিলেবাস ও দক্ষ পরিচালনার অভাব প্রকটভাবে। অতএব কুরআনুল কারিম ও তার শিক্ষার কেন্দ্রগুলো অবহেলার শিকার একভাবে নয়, বিভিন্নভাবে। কোনো বিবেচনায় হাফিযদের সংখ্যা বেশী হলেও, গায়রে-হাফিযদের কুরআনুল কারিমের প্রতি অবহেলা এতো অধিক যে, তাদের ঈমান ও ইসলাম পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ!
আমাদের দেশের হাফিয সাহেবদের দীন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা স্বাভাবিক অবস্থায় পরিণত হয়েছে! ফলে কুরআনুল কারিমের মকতব বা হিফয খানাগুলো বিদআত ও কুসংস্কারের আড্ডা, বরং শিরকের পরিচর্যা কেন্দ্রে পরিণত! এ অধঃপতন একদিন কিংবা একদিক থেকে আসেনি, দুঃখজনক হলেও সত্য এ দেশে দীর্ঘ দিন থেকে যারা দীনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের পথ ধরে মুসলিম সমাজে বিদআত, কুসংস্কার, বরং শিরক পর্যন্ত অনুপ্রবেশ করেছে, যার ফর্দ অনেক দীর্ঘ, অনেক বেদনাদায়ক।
বইটি পড়ে কেউ বিশুদ্ধভাবে কুরআনুল কারিম শিখবে, কেউ সঠিক পদ্ধতিতে হিফয করবে, কেউ হিফযের প্রতি আগ্রহী হবে। হিফযের ময়দানে নবাগত ও হিফয শাখার পরিচালকবৃন্দ সঠিক নির্দেশনা পাবে, প্রচলিত হিফয খানাগুলো কুসংস্কার মুক্ত হবে, হাফিয সাহেবগণ কুরআনুল কারিমের মহত্ত্ব অন্তরে ধারণ করবে, এটাই আমাদের কামনা।
একটি পরিশিষ্ট দ্বারা হাফিয সাহেবদের কতিপয় ভুলভ্রান্তি দূর ও কুসংস্কার মুক্ত করার প্রচেষ্টা করা হয়েছে। এ জন্য প্রত্যেকটি আলোচনা প্রমাণসহ উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। হে আল্লাহ, আমাদের এ আমলটুকু কবুল করুন এবং আপনার রহমত ও মাগফেরাত দ্বারা আমাদেরকে ঢেকে নিন।


মুসলিম জীবনে কুরআনুল কারিমের গুরুত্ব বলার অপেক্ষা রাখে না। সহি আকিদা, বিশুদ্ধ ইবাদত ও উত্তম আখলাকের উৎস এ কুরআন, এটিই মুসলিমদের জীবন বিধান। এতে রয়েছে আদর্শ সমাজ, সুশৃঙ্খল জাতি ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয় উপাদান। মুসলিমরা যদি কুরআনুল কারিমের গুরুত্ব বুঝে তার প্রতি ঈমান নবায়ন করে, তার আদেশ-নিষেধ মেনে চলে ও তাকে আঁকড়ে ধরে, তাহলে তারা পবিত্র জীবন, রাজনৈতিক দক্ষতা, সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, আদর্শ সমাজ ও প্রচুর নিয়ামত লাভ করবে সন্দেহ নেই। আল্লাহ তা’আলা বলেন:
﴿وَلَوۡ أَنَّ أَهۡلَ ٱلۡقُرَىٰٓ ءَامَنُواْ وَٱتَّقَوۡاْ لَفَتَحۡنَا عَلَيۡهِم بَرَكَٰتٖ مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ وَلَٰكِن كَذَّبُواْ فَأَخَذۡنَٰهُم بِمَا كَانُواْ يَكۡسِبُونَ ٩٦ ﴾ [الاعراف: ٩٥]
“যদি জনপদবাসী ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত, অবশ্যই আমি তাদের উপর আসমান ও জমিনের বরকত খুলে দিতাম, কিন্তু তারা মিথ্যারোপ করেছে, ফলে তারা যা উপার্জন করত, তার কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি”।
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের ন্যায় মুসলিমরা যদি তিলাওয়াত ও হিফয দ্বারা কুরআনকে আঁকড়ে ধরে, কুরআন বুঝে ও তার উপর আমল করে, তাহলে তাদের হারানো গৌরব, বিস্মৃত সম্মান ও আকাশ চুম্বী সফলতা ফিরে আসবে অবশ্যই। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রإِنَّ اللهَ يَرْفَعُ بِهَذَا الكِتَابِ أَقْوَاماً وَيَضَعُ بِهِ آخرِينَগ্ধ. رواه مسلم
“নিশ্চয় আল্লাহ এই গ্রন্থ দ্বারা এক জনগোষ্ঠীর উত্থান ঘটান এবং তার দ্বারা অপর জনগোষ্ঠীর পতন ঘটান।”
বলাবাহুল্য, আমাদের পতনের মূল কারণ কুরআনুল কারিম ত্যাগ করা, কেউ তার বিশুদ্ধ তিলাওয়াত ত্যাগ করেছি, কেউ তার হিফয ত্যাগ করেছি, কেউ তার উপর আমল করা ত্যাগ করেছি, অতএব আমরা যদি উত্থান ও উন্নতি চাই, তাহলে কুরআনকে আঁকড়ে ধরা ব্যতীত কোনো পথ নেই। সাহাবায়ে কেরাম যেভাবে সফলতার উচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন, আমাদেরকে সে পথ ধরে এগুতে হবে। ইমাম মালিক রহ. বলেন, ওহাব ইবনে কায়সান আমাদের নিকট এসে বসতেন, অতঃপর তিনি না বলে প্রস্থান করতেন না:
إِنَّهُ لا يُصْلِحُ آخِرَ هَذِهِ الأُمَّةِ إِلا مَا أَصْلَحَ أَوَّلَهَاগ্ধ.
“এ উম্মতের শেষাংশ কখনো সংশোধন করতে পারবে না, তবে যে বস্তু তার প্রথমাংশ সংশোধন করেছে তা ব্যতীত”। অতএব মুসলিমরা যদি তাদের পূর্বপুরুষদের ন্যায় কুরআনকে আঁকড়ে ধরে, আল্লাহর সাহায্য তাদেরকে হাত-ছানি দিয়ে ডাকবে, সন্দেহ নেই।

কুরআনুল কারিমের কতক বৈশিষ্ট্য
কুরআনুল কারিমকে আল্লাহ তা’আলা বিভিন্ন বিশেষণ দ্বারা গুণান্বিত করেছেন, যা তার মর্যাদা-মহত্ত্ব ও গুরুত্বকে প্রকাশ করে, এখানে তার কয়েকটি গুণ উল্লেখ করছি:
১. ‘রূহ’: কুরআনুল কারিমকে আল্লাহ তা‘আলা ‘রূহ’ বলেছেন, যা ব্যতীত মানুষ মৃত ও নিশ্চল। তিনি বলেন:
﴿ وَكَذَٰلِكَ أَوۡحَيۡنَآ إِلَيۡكَ رُوحٗا مِّنۡ أَمۡرِنَاۚ مَا كُنتَ تَدۡرِي مَا ٱلۡكِتَٰبُ وَلَا ٱلۡإِيمَٰنُ ٥٢ ﴾ [الشورى: ٥٢]
“অনুরূপভাবে আমি তোমার কাছে আমার নির্দেশ থেকে ‘রূহ’কে ওহী যোগে প্রেরণ করেছি; তুমি জানতে না কিতাব কী এবং ঈমান কী”? অতএব এ আয়াত প্রমাণ করে কুরআনহীন মুসলিম জাতি রূহ বিহীন মানুষের ন্যায় মৃত ও মূল্যহীন।
২. ‘নূর’: কুরআনুল কারিমকে আল্লাহ তা‘আলা ‘নূর’ বলেছেন, যা ব্যতীত মানব জাতি অন্ধকারে নিমজ্জিত। তিনি বলেন:
﴿ قَدۡ جَآءَكُم مِّنَ ٱللَّهِ نُورٞ وَكِتَٰبٞ مُّبِينٞ ١٥ يَهۡدِي بِهِ ٱللَّهُ مَنِ ٱتَّبَعَ رِضۡوَٰنَهُۥ سُبُلَ ٱلسَّلَٰمِ وَيُخۡرِجُهُم مِّنَ ٱلظُّلُمَٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ بِإِذۡنِهِۦ ١٦ ﴾ [المائ‍دة: ١٥، ١٦]
“অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে আলো ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে, আল্লাহ তার দ্বারা তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তার সন্তুষ্টির অনুসরণ করে; এবং তাদেরকে তিনি স্বীয় নির্দেশ দ্বারা অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করেন”। অতএব কুরআনুল কারিম ব্যতীত মুসলিম জাতি পথহারা, দিকভ্রষ্ট ও অন্ধকারে নিমজ্জিত।
৩. ‘পথপ্রদর্শক’: কুরআনুল কারিমকে আল্লাহ তা‘আলা পথ-প্রদর্শক বলেছেন, যা ব্যতীত মানব জাতি পথভ্রষ্ট। তিনি বলেন:
﴿ إِنَّ هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانَ يَهۡدِي لِلَّتِي هِيَ أَقۡوَمُ وَيُبَشِّرُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٩ ﴾ [الاسراء: ٩]
“নিশ্চয় এ কুরআন এমন একটি পথ দেখায় যা সবচেয়ে সরল”। অতএব কুরআনুল কারিম ত্যাগকারী জাতি সরল পথহীন ও দিকভ্রষ্ট।
৪. ‘প্রতিষেধক’: কুরআনুল কারিমকে আল্লাহ তা‘আলা প্রতিষেধক বলেছেন, যা ব্যতীত মানব জাতি রোগগ্রস্ত। তিনি বলেন:
﴿ قُلۡ هُوَ لِلَّذِينَ ءَامَنُواْ هُدٗى وَشِفَآءٞۚ ٤٤ ﴾ [فصلت: ٤٤]
“বল, এটি মুমিনদের জন্য হিদায়েত ও প্রতিষেধক”। অতএব কুরআন ত্যাগকারী জাতি রোগগ্রস্ত, তারা উন্নতির পথে ও সুস্থ জাতির জন্য বোঝা স্বরূপ।
৫. ‘চিরসত্য’: কুরআনুল কারিমকে আল্লাহ তা‘আলা চিরসত্য বলেছেন, যা ব্যতীত মানব জাতি মিথ্যার আবর্তে নিমজ্জিত। তিনি বলেন:
﴿ وَبِٱلۡحَقِّ أَنزَلۡنَٰهُ وَبِٱلۡحَقِّ نَزَلَۗ ١٠٥ ﴾ [الاسراء: ١٠٥]
“আর আমি তা সত্যসহ নাযিল করেছি এবং তা সত্যসহ নাযিল হয়েছে”। অন্যত্র তিনি বলেন:
﴿وَإِنَّهُۥ لَكِتَٰبٌ عَزِيزٞ ٤١ لَّا يَأۡتِيهِ ٱلۡبَٰطِلُ مِنۢ بَيۡنِ يَدَيۡهِ وَلَا مِنۡ خَلۡفِهِۦۖ تَنزِيلٞ مِّنۡ حَكِيمٍ حَمِيدٖ ٤٢ ﴾ [فصلت: ٤١، ٤٢]
“আর নিশ্চয় এটি এক মহা সম্মানিত গ্রন্থ, তাতে বাতিল প্রবেশ করতে পারে না, না সামনে থেকে, না পিছন থেকে। প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিতের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত”।
অতএব কুরআনুল কারিমের ধারক রূহের অধিকারী তাই তিনি জীবিত, আলোর অধিকারী তাই তিনি আলোকিত, পথপ্রদর্শকের অধিকারী তাই তিনি সুপথপ্রাপ্ত, প্রতিষেধকের অধিকারী তাই তিনি সুস্থ, চিরসত্যের অধিকারী তাই তিনি মিথ্যা থেকে মুক্ত।

কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করার ফজিলত
১. আবু উমামাহ বাহেলি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
্রاقْرَؤُوا القُرْآنَ ؛ فَإِنَّهُ يَأتِي يَوْمَ القِيَامَةِ شَفِيعاً لأَصْحَابِهِগ্ধ. رواه مسلم
“তোমরা কুরআন পাঠ কর, কারণ কিয়ামতের দিন কুরআন তার পাঠকের জন্য সুপারিশকারী হিসাবে আগমন করবে।”
২. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
্রالْمَاهِرُ بِالْقُرْآنِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ، وَالَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَيَتَتَعْتَعُ فِيهِ وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌّ، لَهُ أَجْرَانِগ্ধ.
“কুরআনুল কারিমে পারদর্শী ব্যক্তি পুণ্যবান সম্মানিত মালায়েকাদের সঙ্গী। আর যে কুরআন পাঠ করে ও তাতে তোতলায়, এমতাবস্থায় যে কুরআন তার উপর কষ্টকর, তার জন্য রয়েছে দু’টি সওয়াব।”
৩. আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রمَثَلُ الْمُؤْمِنِ الَّذِيْ يَقْرَأُ القُرْآنَ مَثَلُ الأُتْرُجَّةِ: رِيحُهَا طَيِّبٌ وَطَعْمُهَا طَيِّبٌ، وَمَثَلُ الْمُؤْمِنِ الَّذِيْ لاَ يَقْرَأُ القُرْآنَ كَمَثَلِ التَّمْرَةِ: لارِيحَ لَهَا وَطَعْمُهَا حُلْوٌ، وَمَثلُ المُنَافِقِ الَّذِيْ يَقرَأُ القُرآنَ كَمَثلِ الرَّيحَانَةِ: ريحُهَا طَيِّبٌ وَطَعْمُهَا مُرٌّ، وَمَثَلُ المُنَافِقِ الَّذِيْ لاَ يَقْرَأُ القُرْآنَ كَمَثلِ الحَنْظَلَةِ: لَيْسَ لَهَا رِيحٌ وَطَعْمُهَا مُرٌّগ্ধ. متفقٌ عَلَيْهِ
“কুরআন পাঠকারী মুমিনের উদাহরণ হচ্ছে উতরুজ্জার উদাহরণ; যার ঘ্রাণ উত্তম এবং তার স্বাদও উত্তম। আর যে মুমিন কুরআন পড়ে না তার উদাহরণ হচ্ছে খেজুরের উদাহরণ; যার কোনো ঘ্রাণ নেই, তবে তার স্বাদ সুমিষ্ট। আর কুরআন পাঠকারী মুনাফিকের উদাহরণ হচ্ছে রায়হানের উদাহরণ; যার ঘ্রাণ উত্তম, তবে তার স্বাদ তেতো। আর যে মুনাফিক কুরআন পড়ে না তার উদাহরণ হচ্ছে মাকাল ফলের উদাহরণ; যার ঘ্রাণ নেই, আর তার স্বাদও তেতো।”
৪. আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সা. বলেছেন,
্রما اجتمع قوم في بيت من بيوت الله يتلون كتاب الله ويتدارسونه فيما بينهم إلا نزلت عليهم السكينة ، وغشيتهم الرحمة ، وحفتهم الملائكة ، وذكرهم الله فيمن عندهগ্ধ. رواه مسلم .
“কোনো কওম আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত ও পরস্পরের মাঝে তার পর্যালোচনার জন্য আল্লাহর ঘরসমূহ থেকে একটি ঘরে যখন জড় হয়, তাদের উপর সাকিনা নাযিল হয়, তাদেরকে রহমত ঢেকে নেয়, মালায়েকাগণ তাদেরকে ঘিরে নেয় এবং আল্লাহ তাদের আলোচনা করেন যারা তার নিকট আছে তাদের সামনে”।
৫. কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করার ফলে সাওয়াব বর্ধিত ও গুনাহ মাফ হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ يَتۡلُونَ كِتَٰبَ ٱللَّهِ وَأَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَأَنفَقُواْ مِمَّا رَزَقۡنَٰهُمۡ سِرّٗا وَعَلَانِيَةٗ يَرۡجُونَ تِجَٰرَةٗ لَّن تَبُورَ ٢٩ لِيُوَفِّيَهُمۡ أُجُورَهُمۡ وَيَزِيدَهُم مِّن فَضۡلِهِۦٓۚ إِنَّهُۥ غَفُورٞ شَكُورٞ ٣٠ ﴾ [فاطر: ٢٩، ٣٠]
“নিশ্চয় যারা আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে, সালাত কায়েম করে এবং আমি যে রিযক তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে তারা গোপনে ও প্রকাশ্যে সদকা করে, তারা এমন এক ব্যবসার প্রত্যাশা করছে, যা কখনো ধ্বংস হবে না, আল্লাহ তাদেরকে তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণ দিবেন এবং তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে বাড়িয়ে দিবেন, নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনকারী”।

কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করার আদব
কুরআনুল কারিম আল্লাহ তা‘আলার কালাম, আল্লাহ মহান তার কালামও মহান। তার কালাম তিলাওয়াত করার সময় যদি তার মহত্ত্ব-মর্যাদা ও আদব রক্ষা করা হয়, তাহলে তিলাওয়াত হবে বরকতময়, সাওয়াবের অধিকারী ও তার সন্তুষ্টির জিম্মাদার। হিফয-খানার শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশী কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করেন, তাই এখানে তার কতিপয় আদব উল্লেখ করছি:
১. বিশুদ্ধ নিয়তে তিলাওয়াত করা: একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করা, কারণ যে তিলাওয়াত দ্বারা তার সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য হয় না, সে তিলাওয়াত তিনি গ্রহণ করেন। তিনি বলেন:
﴿وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ ٥﴾ [البينة: ٥]
“আর তাদেরেকে কেবল এই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তারই জন্য দীনকে (ইবাদতকে) একনিষ্ঠ করে”। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রإِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبَلُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا كَانَ لَهُ خَالِصًا، وَابْتُغِيَ بِهِ وَجْهُهُগ্ধ.
“নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা কোনো আমল কবুল করেন না, তবে তা ব্যতীত যা শুধু তার জন্য এবং যার দ্বারা তার সন্তুষ্টি হাসিল করা হয়েছে”। অতএব আল্লাহর সন্তুষ্টি, তিলাওয়াতের সওয়াব ও কুরআনুল কারিমকে আঁকড়ে ধরার নিয়তে তিলাওয়াত করা, তাতে সুনাম-সুখ্যাতিকে প্রশ্রয় না দেওয়া।
২. তিলাওয়াতের শুরুতে অযু ও মিসওয়াক করা: পবিত্র অবস্থায় কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করা একটি বিশেষ আদব। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রأَنْ لَا يَمَسَّ الْقُرْآنَ إِلَّا طَاهِرٌগ্ধ.
“পবিত্র সত্তা ব্যতীত কেউ কুরআন স্পর্শ করবে না”। যদিও কতক আলেম বলেন অযু ব্যতীত কুরআনুল কারিম স্পর্শ করা বৈধ, তারাও বলেন তিলাওয়াতের শুরুতে অযু করা উত্তম। একাধিক সহি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত মিসওয়াক করা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুরুত্বপূর্ণ এক সুন্নত। তাই মিসওয়াক দ্বারা মুখের দুর্গন্ধ দূরে করে পবিত্র অবস্থায় তিলাওয়াত করা উত্তম, কারণ কুরআন পাঠকারী আল্লাহর সাথে কথোপকথন করেন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রالسواك مطهرة للفم، مرضاة للربগ্ধ.
“মিসওয়াক হচ্ছে মুখ পবিত্র করা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল করার বস্তা”। হাদিসটি সহি, তিরমিযি, ইবনে খুজাইমাহ ও ইমাম আহমদর রহ. বর্ণনা করেছেন।
৩. তারতীলসহ তিলাওয়াত করা: তারতীলসহ বা তাজবিদ অনুসরণ করে কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করা। আল্লাহ তা’আলা বলে:
﴿ وَرَتِّلِ ٱلۡقُرۡءَانَ تَرۡتِيلًا ٤ ﴾ [المزمل: ٤]
“আর কুরআনকে তারতীলসহ তিলাওয়াত কর”। অপর আয়াতে তিনি বলেন:
﴿وَقُرۡءَانٗا فَرَقۡنَٰهُ لِتَقۡرَأَهُۥ عَلَى ٱلنَّاسِ عَلَىٰ مُكۡثٖ وَنَزَّلۡنَٰهُ تَنزِيلٗا ١٠٦ ﴾ [الاسراء: ١٠٦]
“আর আমি কুরআনকে নাযিল করেছি কিছু কিছু করে, যেন তুমি তা মানুষের কাছে পাঠ করতে পার ধীরেধীরে এবং আমি তা নাযিল করেছি পর্যায়ক্রমে”।
বিখ্যাত তাবীঈ কাতাদাহ রহ. বলেন, আমি আনাস ইবনে মালিককে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিরাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি, তিনি বলেন:كَانَ يَمُدُّ مَدًّا “তিনি টেনেটুনে পড়তেন”। অতএব তারতীলসহ, মদ-গুন্নাহ ঠিক রেখে কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করা অন্যতম এক আদব।
৪. তিলাওয়াত করার সময় ক্রন্দন অবস্থার সৃষ্টি করা: আল্লাহ তা’আলা বলেন:
﴿إِذَا تُتۡلَىٰ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتُ ٱلرَّحۡمَٰنِ خَرُّواْۤ سُجَّدٗاۤ وَبُكِيّٗا۩ ٥٨﴾ [مريم: ٥٨]
“যখন তাদের কাছে পরম করুণাময়ের আয়াতসমূহ পাঠ করা হত, তারা কাঁদতে কাঁদতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ত”। অপর আয়াতে তিনি বলেন:
﴿ قُلۡ ءَامِنُواْ بِهِۦٓ أَوۡ لَا تُؤۡمِنُوٓاْۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡعِلۡمَ مِن قَبۡلِهِۦٓ إِذَا يُتۡلَىٰ عَلَيۡهِمۡ يَخِرُّونَۤ لِلۡأَذۡقَانِۤ سُجَّدٗاۤ ١٠٧ وَيَقُولُونَ سُبۡحَٰنَ رَبِّنَآ إِن كَانَ وَعۡدُ رَبِّنَا لَمَفۡعُولٗا ١٠٨ وَيَخِرُّونَ لِلۡأَذۡقَانِ يَبۡكُونَ وَيَزِيدُهُمۡ خُشُوعٗا۩ ١٠٩ ﴾ [الاسراء: ١٠٧، ١٠٩]
“বল, তোমরা এতে ঈমান আন বা ঈমান না আন, নিশ্চয় তার পূর্বে যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে, তাদের কাছে যখন এটা পাঠ করা হয় তখন তারা সিজদাবনত হয়ে লুটিয়ে পড়ে। আর তারা বলে, পবিত্র মহান আমাদের রব! আমাদের রবরে ওয়াদা অবশ্যই কার্যকর হয়ে থাকে। আর তারা কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ে এবং এটা তাদের বিনিয় বৃদ্ধি করে”। অপর আয়াতে কতক নেককার বান্দার প্রশংসা করে তিনি বলেন:
﴿وَإِذَا سَمِعُواْ مَآ أُنزِلَ إِلَى ٱلرَّسُولِ تَرَىٰٓ أَعۡيُنَهُمۡ تَفِيضُ مِنَ ٱلدَّمۡعِ مِمَّا عَرَفُواْ مِنَ ٱلۡحَقِّۖ ٨٣ ﴾ [المائ‍دة: ٨٣]
“আর রাসূলের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে যখন তারা তা শুনে, তুমি দেখবে তাদের চক্ষু অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছে, কারণ তারা সত্যকে উপলব্ধি করতে পেরেছে”। অতএব তিলাওয়াত শুধু মুখে সীমাবদ্ধ না রেখে অন্তরকে তার সাথে শামিল করা এবং তার দ্বারা অনুপ্রাণিত ও প্রভাবিত হওয়া।
৫. তিলাওয়াত করার সময় দোয়া করা: রহমত, নিয়ামত ও জান্নাতের আলোচনার সময় আল্লাহর নিকট এসব বস্তু প্রার্থনা করা এবং শাস্তি, গোস্বা ও জাহান্নামের আলোচনার সময় তার নিকট এসব বস্তু থেকে আশ্রয় চাওয়া। হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
্রصَلَّى، فَكَانَ إِذَا مَرَّ بِآيَةِ رَحْمَةٍ سَأَلَ، وَإِذَا مَرَّ بِآيَةِ عَذَابٍ اسْتَجَارَ، وَإِذَا مَرَّ بِآيَةٍ فِيهَا تَنْزِيهٌ لِلَّهِ سَبَّحَগ্ধ.
“নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত আদায় করলেন, যখন তিনি রহমতের আয়াত অতিক্রম করতেন প্রার্থনা করতেন, যখন তিনি শাস্তির আয়াত অতিক্রম করতেন আশ্রয় প্রার্থনা করতেন, যখন তিনি কোনো আয়াত অতিক্রম করতেন যাতে আল্লাহর পবিত্রতা রয়েছে, তিনি পবিত্রতা ঘোষণা করতেন”।
৬. তিলাওয়াত করার সময় কৃত্রিমতা ত্যাগ করা: তিলাওয়াতের সময় ভ্রু কুঁচকানো, কপাল ভাজ করা, মুখ আকা-বাঁকা করা, বড়-বড় হা করা ও কঠিনভাবে হরফ উচ্চারণ করা দোষণীয়।
৭. নিয়মিত তিলাওয়াত করা: কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করার একটি আদব হচ্ছে নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে তিলাওয়াত করা। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রتَعَاهَدُوا هَذَا القُرْآنَ، فَوَالَّذِيْ نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَهُوَ أَشَدُّ تَفَلُّتاً مِنَ الإِبِلِ فِي عُقُلِهَاগ্ধ. متفقٌ عَلَيْهِ
“এ কুরআন বারবার পড়, সেই সত্তার কসম-যার হাতে মুহাম্মদের জীবন, রশি থেকে উটের পলায়ন করার চেয়েও কুরআন দ্রুত পলায়নপর।” অপর হাদিসে তিনি বলেন:
্রوَإِنَّ أَحَبَّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ مَا دَامَ وَإِنْ قَلَّগ্ধ.
“আর নিশ্চয় আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল হচ্ছে যা নিয়মিত হয়, যদিও তার সংখ্যা কম”। অতএব মধ্যপন্থা বজায় রেখে কুরআনুল কারিম নিয়মিত তিলাওয়াত করা এক বিশেষ আদব। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَكَذَٰلِكَ جَعَلۡنَٰكُمۡ أُمَّةٗ وَسَطٗا ١٤٣ ﴾ [البقرة: ١٤٣]
“আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি”। আমরা মধ্যপন্থী উম্মত, তাই আমাদের তিলাওয়াত হবে মধ্যপন্থী। প্রথম দিন বেশি তিলাওয়াত করে পর দিন তিলাওয়াত না করা মধ্যপন্থার বিপরীত।
৮. বিরক্তিসহ তিলাওয়াত না করা: আগ্রহ নিয়ে তিলাওয়াত আরম্ভ করা এবং বিরক্তি সৃষ্টির আগে তিলাওয়াত বন্ধ করা। জুনদুব ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রاقْرَؤُوا الْقُرْآنَ مَا ائْتَلَفَتْ عَلَيْهِ قُلُوبُكُمْ، فَإِذَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ، فَقُومُوا عَنْهُগ্ধ.
“তোমরা কুরআন তিলাওয়াত কর যতক্ষণ তার প্রতি তোমাদের অন্তরের আগ্রহ থাকে, যখন তাতে অনাগ্রহের সৃষ্টি হয় তোমরা তার থেকে উঠে পড়”।
৯. দুর্বল হাদিসসমূহ ত্যাগ করা: দুর্বল হাদিসগুলো মানুষকে প্রচুর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করে, বিশেষভাবে কুরআনুল কারিমের ক্ষেত্রে। উদাহরণত ফজরের পর সূরা ইয়াসিন ও মাগরিবের পর সূরা ওয়াকি‘আর বিশেষ ফজিলত আমাদের দেশে খুব প্রচলিত, যার স্বপক্ষে দুর্বল হাদিস ব্যতীত কোনো সহি হাদিস নেই। দেখা যায় ফজরের পর সূরা ইয়াসিন ও মাগরিবের পর সূরা ওয়াকি‘আহ পাঠকারী কুরআনুল কারিমের অন্যান্য অংশ পড়ার সময় পায় না, তাই বছরের পর বছর দু’একটি সূরায় সীমাবদ্ধ থাকে, ফলে পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করার বরকত থেকে বঞ্চিত হয়। তবে ফজিলতপূর্ণ সূরাসমূহ অবশ্যই পাঠ করা, যেমন সূরা বাকারা, আলে-ইমরান, সূরা কাহাফ, বনি ইসরাইল/ ইসরা, যুমার, মুলক এবং সূরা নাস ও ফালাক ইত্যাদি তাতে এ জাতীয় অনিষ্ট নেই।
১০. তিন দিনের কমে কুরআনুল কারিম খতম না করা: নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রلَمْ يَفْقَهْ مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ فِي أَقَلَّ مِنْ ثَلاثٍগ্ধ.
“তিন দিনের কম সময়ে যে কুরআন খতম করল সে কুরআন বুঝল না”। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রاقْرَإِ الْقُرْآنَ فِي كُلِّ شَهْرٍ، قَالَ: إِنِّي أُطِيقُ أَكْثَرَ، فَمَا زَالَ حَتَّى قَالَ فِي ثَلَاثٍগ্ধ.
“প্রত্যেক মাসে এক খতম কর, তিনি বললেন: আমি অধিক সামর্থ্য রাখি। তিনি কমাতে থাকলেন-অবশেষে বললেন: তিন দিনে খতম কর”। অপর হাদিসে এসেছে:
্রفَاقْرَأْهُ فِي سَبْعٍ وَلَا تَزِدْ عَلَى ذَلِكَগ্ধ.
“সাত দিনে খতম কর, তার অতিরিক্ত কর না”। অর্থাৎ সাত দিনের কম সময়ে কুরআন খতম কর না।

হিফয করার বয়স
ইলমের সফর সবচেয়ে দীর্ঘ, পুরো জীবনের সফর, তার জন্য নির্দিষ্ট বয়স বা সীমা-রেখা নেই। অতএব, কুরআনুল কারিম হিফয করার উপযুক্ত সময় যাই হোক, আল্লাহ যখন বুঝ দান করেন তারপর থেকে কোনো সময় নষ্ট না করা। কারণ, কুরআন সর্বোত্তম ইলম। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রالدُّنيَا مَلعُونَةٌ ، مَلعُونٌ مَا فِيهَا ، إِلَّا ذِكرُ اللَّهِ ، وَمَا وَالَاهُ ، وَعَالِمٌ أَوَ مُتَعَلِّمٌগ্ধ.
“দুনিয়া অভিশপ্ত, অভিশপ্ত তার মাঝে বিদ্যমান যাবতীয় বস্তু, তবে আল্লাহর যিকর ও তার সহযোগী বিষয় এবং আলেম ও ইলম অন্বেষণকারী ব্যতীত”। কুরআনুল কারিম ঈর্ষার বস্তু, তার জন্য বয়স ও ব্যস্ততা বাঁধা হতে পারে না। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রلَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ: رَجُلٌ عَلَّمَهُ اللَّهُ الْقُرْآنَ فَهُوَ يَتْلُوهُ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ… গ্ধ.
“কোনো হিংসা নেই তবে দু’জন্য ব্যক্তি ব্যতীত: এক-ব্যক্তি যাকে আল্লাহ কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন, সে দিন-রাতের বিভিন্ন অংশে তা তিলাওয়াত করে…”।
ইমাম বুখারি রহ. ‘ইলম ও হিকমতের ক্ষেত্রে ঈর্ষা’র অধ্যায়ে বর্ণনা করেন,
্রوَقَالَ عُمَرُ: تَفَقَّهُوا قَبْلَ أَنْ تُسَوَّدُوا، قَالَ أَبُو عَبْد اللَّهِ: وَبَعْدَ أَنْ تُسَوَّدُوا، وَقَدْ تَعَلَّمَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فِي كِبَرِ سِنِّهِمْগ্ধ.
আর ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন: “নেতৃত্ব আসার আগে ইলম তলব কর”। আবু-আব্দুল্লাহ বলেন: “নেতৃত্ব পাওয়ার পরও ইলম অর্জন কর, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক সাহাবি তাদের বার্ধক্যে ইলম তলব করেছেন”।
সাহাবি ও আদর্শ পুরুষগণ কেউ ছিলেন ব্যবসায়ী, কেউ ছিলেন গভর্নর, কেউ ছিলেন একাধিক স্ত্রী ও অনেক সন্তানের অধিকারী, এসব তাদেরকে কুরআনুল কারিম থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়নি। তারা প্রথম কুরআন মুখস্থ করতেন অতঃপর হাদিস। আল্লাহ তা‘আলা সবাইকে তার কুরআন মুখস্থ করার তাওফিক দান করুন।

কুরআনুল কারিম হিফয করার গুরুত্ব
মুসলিম উম্মাহর বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার কালাম হিফজ করা। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে কুরআনুল কারিম হিফজ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন, যদি কেউ নতুন ইসলাম গ্রহণ করত তাকে কুরআন শিক্ষার উপদেশ দিতেন এবং কোনো মুসলিমের নিকট সোপর্দ করতেন, যে তাকে কুরআন শিক্ষা দিবে। এ কারণে শতাব্দীর পর শতাব্দী গত হওয়ার পরও কুরআন অক্ষত, অবিকৃত ও সংরক্ষিত রয়েছে। উবাদাহ ইবনে সামেত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
্রكَانَ رَسُولُ اللَّهِ ــ صلي الله عليه وسلم ــ يُشْغَلُ، فَإِذَا قَدِمَ رَجُلٌ مُهَاجِرٌ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ــ صلي الله عليه وسلم ــ دَفَعَهُ إِلَى رَجُلٍ مِنَّا يُعَلِّمُهُ الْقُرْآنَগ্ধ.
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব ব্যস্ত ছিলেন, যদি কোনো ব্যক্তি হিজরত করে তার নিকট আসত, তিনি আমাদের কারো নিকট তাকে সোপর্দ করতেন, যে তাকে কুরআন শিক্ষা দিবে”।
এ কারণে সাহাবিদের বৃহৎ সংখ্যা কুরআনুল কারিমের হাফিয ছিলেন, যেমন আবু বকর, ওমর, উসমান, আলী, তালহা, সাদ ও ইবনে মাসউদ প্রমুখগণ। কুরআনুল কারিম হিফয করা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত ও আদর্শ। তিনি হাফিয ছিলেন, রমদানের প্রতি রাতে জিবরীল ‘আলাইহিস সালামের সাথে তিনি কুরআনুল কারিম মুরাজা‘আহ করতেন। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
্রكَانَ رَسُولُ اللَّهِ ــ صلي الله عليه وسلم ــ يُعَلِّمُنَا التَّشَهُّدَ، كَمَا يُعَلِّمُنَا السُّورَةَ مِنَ الْقُرْآنِগ্ধ.
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তাশাহহুদ শিক্ষা দিতেন, যেভাবে তিনি আমাদেরকে কুরআনের সূরা শিক্ষা দিতেন”। তাশাহহুদ শিক্ষার গুরুত্বকে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কুরআনুল কারিমের শিক্ষার সাথে তুলনা করেছেন, কারণ কুরআনুল কারিমের শিক্ষার গুরুত্ব সবার নিকট পরিচিত ছিল।
আমাদের আদর্শ পুরুষগণ সর্বপ্রথম কুরআনুল কারিম হিফযের প্রতি মনোনিবেশ করতেন, কারণ কুরআন হচ্ছে জ্ঞানের উৎস ও সকল জ্ঞানের মাপকাঠি। তারা অনেকে সাবালক হওয়ার পূর্বে তারা হিফয শেষ করেছেন।
মায়মুনি রহ. বলেন: “আমি একদা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহিমাহুল্লাকে জিজ্ঞাসা করি, আমার ছেলেকে আগে কি শিক্ষা দিব কুরআন না-হাদিস, আপনি কি পছন্দ করেন? তিনি বললেন, তুমি আগে কুরআন শিক্ষা দাও। আমি বললাম, পূর্ণ কুরআন শিক্ষা দিব? তিনি বললেন: যদি তার পক্ষে পূর্ণ কুরআন হিফয করা কষ্টকর হয়, তাহলে অংশ বিশেষ শিক্ষা দাও”।
খতিব বাগদাদি রহ. বলেন: “তালিবে ইলম বা ইলম অন্বেষণকারীর কর্তব্য সর্বপ্রথম কুরআনুল কারিম হিফয করা, কারণ কুরআনুল কারিম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বোত্তম ইলমের ভাণ্ডার”।
ইমাম আবু ওমর ইবনে আব্দুল বারর রহ. বলেন: “ইলম অর্জন করার কয়েকটি ধাপ, স্তর ও বিন্যাস রয়েছে, যা লঙ্ঘন করা শিক্ষার্থীর জন্য বাঞ্ছনীয় নয়… অতএব ইলম অর্জন করার প্রথম ধাপ হচ্ছে কুরআনুল কারিম হিফয করা ও তা বুঝা”।
ইমাম নববি রহ. বলেন: “সর্বপ্রথম কুরআনুল কারিম হিফয করা জরুরি। আদর্শ পুরুষগণ কুরআনুল কারিম হিফয করার পূর্বে কাউকে হাদিস ও ফিকহ শিক্ষা দিতেন না। কুরআন হিফয শেষে অন্যান্য ইলম তথা হাদিস-ফিকহে এতটুকুন মগ্ন হওয়া যাবে না, যার ফলে কুরআনুল কারিমের কোনো অংশ ভুলে যাওয়ার উপক্রম হয়”।
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. বলেন: “মানুষ যেসব জ্ঞানকে ইলম বলে, তার সর্বাগ্রে হচ্ছে কুরআনুল কারিম হিফয করা”।
কুরআনুল কারিম হিফয করা খুব সহজ, তার সাথে মেধা অথবা বয়সের বড় সম্পর্ক নেই। অনেক মনীষী তাদের বার্ধক্য ও শেষ বয়সে কুরআনুল কারিম হিফয করেছেন, যারা আরবি জানে না তারাও হিফয করছেন। এ ক্ষেত্রে বড়দের চাইতে ছোটরা অনেক এগিয়ে।
কুরআনুল কারিম হিফয করা শরীয়তের নির্দেশ। হিফয করে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, মুসলিম যখন দৃঢ় ইচ্ছা ও প্রচণ্ড আগ্রহসহ হিফয আরম্ভ করে, অতঃপর অলসতা-শিথিলতা বা ব্যস্ততার কারণে হিফয ত্যাগ করে, তবুও কোনো ক্ষতি নেই, যা হিফয করেছে তা বৃথা যাবে না, কোনো অংশ হিফয না করলেও হিফযের হালাকায় তিলাওয়াতের সাওয়াব থেকে কখনো মাহরূম হবে না।
ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেছেন: “যে কুরআনুল কারিম হিফয করল, সে তার বক্ষ ও পিঠের মাঝে নবুওয়তকে ধারণ করল”। অতএব মুসলিম হিসেবে সবাইকে এ গৌরব অর্জন করার নিমিত্তে ব্রত গ্রহণ করা জরুরি। আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দান করুন।

কুরআনুল কারিম হিফয করার ফজিলত
১. শয়তান থেকে ঘর নিরাপদ থাকে: সাধারণত হাফিয ও হিফয-শাখার ছাত্ররা সবচেয়ে বেশী কুরআন তিলাওয়াত করেন, তাই তাদের ঘর শয়তান থেকে নিরাপদ থাকে। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রلاَ تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ، إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ البَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ البَقرَةِগ্ধ. رواه مسلم
“তোমাদের ঘরগুলোকে তোমরা কবরে পরিণত করো না, নিশ্চয় সে ঘর থেকে শয়তান পলায়ন করে, যেখানে সূরা বাকারাহ পাঠ করা হয়।”
২. হাফিযগণ আল্লাহর পরিবার ভুক্ত: নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রإِنَّ لِلَّهِ أَهْلِينَ مِنَ النَّاسِগ্ধ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ هُمْ؟ قَالَ: ্রهُمْ أَهْلُ الْقُرْآنِ أَهْلُ اللَّهِ وَخَاصَّتُهُগ্ধ.
“নিশ্চয় মানুষদের থেকে আল্লাহর কতক পরিবার (নিজস্ব লোক) রয়েছে, তারা বলল: হে আল্লাহর রাসূল তারা কারা? তিনি বললেন: তারা আহলে কুরআন, আল্লাহর পরিবার ও তার বিশেষ ব্যক্তিবর্গ”। কুরআনুল কারিমের হাফিয আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত, একজন মুসলিমের হিফয হওয়ার জন্য এ প্রেরণাই যথেষ্ট, এটা তাদের প্রতি আল্লাহর মহান অনুগ্রহ।
৩. হাফিযগণ সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে পারেন: নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রاغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ: شَبَابَكَ قَبْلَ هِرَمِكَ، وَصِحَّتَكَ قَبْلَ سَقَمِكَ، وَغِنَاءَكَ قَبْلَ فَقْرِكَ، وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ، وَحَيَاتَكَ قَبْلَ مَوْتِكَগ্ধ.
“পাঁচটি বস্তুকে পাঁচটি বস্তুর পূর্বে গণিমত মনে কর: তোমার যৌবনকে তোমার বার্ধক্যের পূর্বে; তোমার সুস্থতাকে তোমার অসুস্থতার পূর্বে; তোমার সচ্ছলতাকে তোমার অভাবের পূর্বে; তোমার অবসরতাকে তোমার ব্যস্ততার পূর্বে এবং তোমার জীবনকে তোমার মৃত্যুর পূর্বে”। আহলে-কুরআন কখনো তিলাওয়াত করেন, কখনো হিফয করেন, কখনো গবেষণা করেন, কখনো তার উপর আমল করেন। এভাবে তারা প্রতি মুহূর্তের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে পারেন।
৪. হাফিযদের ঈমান উত্তরোত্তর বর্ধিত হয়: হাফিযগণ সর্বাধিক কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করেন, তাই তারা সবচেয়ে বেশী নবী-রাসূলদের বিজয়ের কাহিনী, কাফেরদের পরাজয়ের ঘটনা, মুমিনদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও কাফেরদের প্রতি তার গোস্বার বাণী পড়েন ও শ্রবণ করেন, যার ফলে তাদের ঈমান বর্ধিত হয়। জুনদুব ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
্রكُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَنَحْنُ فِتْيَانٌ حَزَاوِرَةٌ، فَتَعَلَّمْنَا الْإِيمَانَ قَبْلَ أَنْ نَتَعَلَّمَ الْقُرْآنَ، ثُمَّ تَعَلَّمْنَا الْقُرْآنَ فَازْدَدْنَا بِهِ إِيمَانًاগ্ধ.
“আমরা যখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম, তখন সবেমাত্র কৈশোরে পদার্পণ করেছি। অতএব কুরআন শিখার আগে আমরা ঈমান শিখেছি, অতঃপর কুরআন শিখেছি, আর তার দ্বারা আমরা আমাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছি”।
৫. হাফিযগণ তাহাজ্জুদের স্বাদ অনুভব করে: হিফযের বদৌলতে হাফিযগণ তাহাজ্জুদের স্বাদ অনুভব করেন, হিফয না-থাকার কারণে অনেকে এ স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
্রمَنْ قَامَ بِعَشْرِ آيَاتٍ لَمْ يُكْتَبْ مِنَ الْغَافِلِينَ، وَمَنْ قَامَ بِمِائَةِ آيَةٍ كُتِبَ مِنَ الْقَانِتِينَ، وَمَنْ قَامَ بِأَلْفِ آيَةٍ كُتِبَ مِنَ الْمُقَنْطِرِينَগ্ধ.
“যে ব্যক্তি দশ আয়াত নিয়ে কিয়াম করল, তাকে গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় না, আর যে এক-শো আয়াত নিয়ে কিয়াম করল, তাকে কানেতিন তথা ইবাদতকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, আর যে এক-হাজার আয়াত নিয়ে কিয়াম করল, তাকে মুকানতিরিণ তথা অনেক সওয়াব অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়”। কুরআনুল কারিম হিফয করা ব্যতীত এ সাওয়াব অর্জন করা সম্ভব নয়।
৬. হাফিযগণ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত: সালাত ইসলামের দ্বিতীয় রোকন, তাতে ইমামতের হকদার কুরআনুল কারিমের হাফিযগণ। আবু মাসউদ আনসারি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
্রيَؤُمُّ الْقَوْمَ، أَقْرَؤُهُمْ لِكِتَابِ اللَّهِ، فَإِنْ كَانُوا فِي الْقِرَاءَةِ سَوَاءً، فَأَعْلَمُهُمْ بِالسُّنَّةِ، فَإِنْ كَانُوا فِي السُّنَّةِ سَوَاءً، فَأَقْدَمُهُمْ هِجْرَةًগ্ধ.
“কওমের মধ্যে কুরআনের অধিক পাঠক (ধারক) তাদের ইমামত করবে; যদি তারা কিরাতে বরাবর হয়, তাহলে সুন্নত সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী, যদি তারা সুন্নতে বরাবর হয়, তাহলে হিজরতে অগ্রগামী ব্যক্তি ইমামত করবে”।
শুধু জীবিত অবস্থায় নয়, মৃত অবস্থায় কবরেও তারা অগ্রাধিকার প্রাপ্ত। জাবের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের শহীদদের দু’জনকে এক কাপড়ে কাফন দিচ্ছিলেন, অতঃপর বলতেন:
্রأَيُّهُمْ أَكْثَرُ أَخْذًا لِلْقُرْآنِ؟، فَإِذَا أُشِيرَ لَهُ إِلَى أَحَدِهِمَا قَدَّمَهُ فِي اللَّحْدِ، وَقَالَ: أَنَا شَهِيدٌ عَلَى هَؤُلَاءِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَأَمَرَ بِدَفْنِهِمْ فِي دِمَائِهِمْ، وَلَمْ يُغَسَّلُوا، وَلَمْ يُصَلَّ عَلَيْهِمْগ্ধ.
“তাদের মাঝে কুরআনের অধিক ধারক কে”? যখন তাদের কাউকে চিহ্নিত করা হত, তিনি তাকে কবরে আগে রাখতেন; এবং বলতেন: “কিয়ামতের দিন আমি তাদের সাক্ষী হব”। তিনি তাদেরকে তাদের রক্তসহ দাফন করার নির্দেশ দেন, তাদের গোসল দেওয়া হয়নি এবং তাদের উপর সালাত আদায় করাও হয়নি”। অতএব কুরআনুল কারিমের হাফিয জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় অগ্রাধিকার প্রাপ্ত।
৭. হাফিযগণ জান্নাতের উঁচু মর্যাদার অধিকারী: নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রيُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ: اِقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا، فَإِنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَؤُهَاগ্ধ.
“কুরআনের ধারককে বলা হবে, ‘তুমি পড় ও চড় এবং তারতীলসহ পড়, যেভাবে তারতীলসহ দুনিয়াতে পড়তে। কারণ, তোমার মর্যাদা সর্বশেষ আয়াতের নিকট, যা তুমি পড়বে।” অপর হাদিসে এসেছে:
্রيَجِيءُ الْقُرْآنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَقُولُ: يَا رَبِّ حَلِّهِ فَيُلْبَسُ تَاجَ الْكَرَامَةِ، ثُمَّ يَقُولُ: يَا رَبِّ زِدْهُ فَيُلْبَسُ حُلَّةَ الْكَرَامَةِ، ثُمَّ يَقُولُ: يَا رَبِّ ارْضَ عَنْهُ فَيَرْضَى عَنْهُ، فَيُقَالُ لَهُ: اقْرَأْ وَارْقَ وَتُزَادُ بِكُلِّ آيَةٍ حَسَنَةًগ্ধ.
“কিয়ামতের দিন কুরআন আসবে ও বলবে: হে আমার রব, তাকে পরিধান করাও, তাকে সম্মানের টুপি পড়ানো হবে। অতঃপর সে বলবে: হে আমার রব, তাকে বৃদ্ধি করে দাও, তাকে সম্মানের অলঙ্কার পড়ানো হবে, অতঃপর সে বলবে: হে আমার রব তার উপর সন্তুষ্ট হও, তিনি তার উপর সন্তুষ্ট হবেন। অতঃপর তাকে বলা হবে: পড় ও উপড়ে চর এবং প্রত্যেক আয়াতের মোকাবিলায় একটি করে নেকি বর্ধিত করা হবে”।
৮. হাফিযগণ ঈর্ষার পাত্র: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রلَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ: رَجُلٌ عَلَّمَهُ اللَّهُ الْقُرْآنَ فَهُوَ يَتْلُوهُ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ، فَسَمِعَهُ جَارٌ لَهُ، فَقَالَ: لَيْتَنِي أُوتِيتُ مِثْلَ مَا أُوتِيَ فُلَانٌ فَعَمِلْتُ مِثْلَ مَا يَعْمَلُ، وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا فَهُوَ يُهْلِكُهُ فِي الْحَقِّ، فَقَالَ رَجُلٌ: لَيْتَنِي أُوتِيتُ مِثْلَ مَا أُوتِيَ فُلَانٌ فَعَمِلْتُ مِثْلَ مَا يَعْمَلُগ্ধ.
“দু’জন্য ব্যক্তি ব্যতীত কোনো হিংসা নেই, এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন, সে তা দিন-রাতের বিভিন্ন অংশে তিলাওয়াত করে। অতঃপর তার এক প্রতিবেশী শুনে বলে: যদি আমাকে অনুরূপ দেওয়া হত, যেরূপ অমুককে দেওয়া হয়েছে তাহলে আমিও তার মত আমল করতাম। আর অপর ব্যক্তি-যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, সে তা সত্য পথে খরচ করে। এক ব্যক্তি বলল: যদি অমুককে যেরূপ দেওয়া হয়েছে আমাকেও সেরূপ দেওয়া হয়, তাহলে আমিও করব যেরূপ সে করে”।
৯. হাফিযগণ দজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ: দজ্জালের আত্মপ্রকাশ কিয়ামতের সবচেয়ে বড় আলামত, দুনিয়াতে তার চেয়ে বড় কোনো ফিতনা নেই। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
্রمَنْ حَفِظَ عَشْرَ آيَاتٍ مِنْ أَوَّلِ سُورَةِ الْكَهْف عُصِمَ مِنَ الدَّجَّالِ গ্ধ.
“যে ব্যক্তি সূরা কাহাফের প্রথম থেকে দশটি আয়াত মুখস্থ করবে তাকে দজ্জাল থেকে নিরাপদ রাখা হবে”।
১০. কুরআনুল কারিমের হিফয নেককার নারীদের দেন মোহর: অনেক আদর্শ পূর্বপুরুষ কুরআনুল কারিমের কতক মুখস্থ সূরার বিনিময় নেককার নারীদের বিয়ে করেছেন। সাহাল ইবনে সাদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, জনৈক নারী নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমার নফস আপনাকে হেবা করতে এসেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকালেন। অতঃপর তার দিকে তাকালেন ও অবনত করলেন, অতঃপর তিনি মাথা ঝুঁকালেন। মহিলাটি যখন দেখল, তিনি তার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না বসে পড়ল। তার সাহাবিদের থেকে একজন উঠে বলল: হে আল্লাহর রাসূল, যদি আপনার তাকে প্রয়োজন না হয়, আমার নিকট তাকে বিয়ে দিয়ে দিন। তিনি বললেন: তোমার কিছু আছে? সে বলল: না, হে আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন: বাড়িতে যাও, দেখ কিছু পাও কিনা? সে গেল, অতঃপর ফিরে আসল ও বলল: হে আল্লাহর রাসূল কিছু পায়নি। তিনি বললেন: দেখ, যদিও একটি লোহার আঙ্কটি পাও; সে বলল: তবে আমার এ লুঙ্গি আছে, তার জন্য তার অর্ধেক। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
্রمَا تَصْنَعُ بِإِزَارِكَ، إِنْ لَبِسْتَهُ لَمْ يَكُنْ عَلَيْهَا مِنْهُ شَيْءٌ، وَإِنْ لَبِسَتْهُ لَمْ يَكُنْ عَلَيْكَ شَيْءٌগ্ধ.
“সে তোমার লুঙ্গি দিয়ে কি করবে, যদি তুমি পরিধান কর তার উপর কোনো কাপড় থাকবে না, আর সে পরিধান করলে তোমার উপর কোনো কাপড় থাকবে না”? লোকটি বসে পড়ল, দীর্ঘক্ষণ বসে ছিল, অতঃপর দাঁড়ালো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন সে চলে যাচ্ছে, তাকে ডাকলেন, যখন সে আসল, তিনি বললেন:
্রمَاذَا مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ؟গ্ধ.
“তোমার সাথে কুরআনের কতটুকু অংশ আছে? সে বলল: আমার সাথে অমুক, অমুক ও অমুক সূরা রয়েছে, সে সবগুলো গণনা করল। তিনি বললেন:
্রأَتَقْرَؤُهُنَّ عَنْ ظَهْرِ قَلْبِكَ؟গ্ধ.
তুমি কি এগুলো মুখস্থ পড়তে পার? সে বলল: হ্যাঁ, তিনি বললেন:
্রاذْهَبْ فَقَدْ مَلَّكْتُكَهَا بِمَا مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِগ্ধ.
“যাও, তোমার সাথে কুরআনের যে অংশ আছে, তার বিনিময়ে আমি তোমাকে তার মালিক বানিয়ে দিলাম”।
এভাবে উক্ত সাহাবি কুরআনুল কারিম হিফযের বিনিময়ে বিয়ে করেছেন। হিফযের বিনিময়ে কেউ যদি আপনার নিকট মেয়ে বিয়ে না দেয় ধৈর্য দরুন, হিফযকে মোহর ধার্য করে জান্নাতে অনেক হুর বিয়ে করতে পারবেন।

কুরআনুল কারিম হিফয করার পদ্ধতি
আল্লাহ তা‘আলার প্রতি অগাধ মহব্বত ও গভীর হৃদ্যতা থেকে কুরআনুল কারিম হিফয করার প্রতি উদ্যমী হোন। কুরআন হিফয করা সহজ ও তৃপ্তিদায়ক, যদি কতক পদ্ধতির অনুসরণ করা হয়, তাহলে হিফয অতি সহজ, দ্রুত ও গতিশীল হয়। নিম্নে তাই কতিপয় পদ্ধতি উল্লেখ করছি:
১. হিফয করার শুরুতে নিয়ত বিশুদ্ধ করা: অশুদ্ধ নিয়তের কারণে কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম কুরআনুল কারিমের জনৈক কারীকে ডেকে চেহারার উপর ভর করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রوَرَجُلٌ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ وَعَلَّمَهُ وَقَرَأَ الْقُرْآنَ، فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟، قَالَ: تَعَلَّمْتُ الْعِلْمَ وَعَلَّمْتُهُ وَقَرَأْتُ فِيكَ الْقُرْآنَ، قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ الْعِلْمَ لِيُقَالَ عَالِمٌ وَقَرَأْتَ الْقُرْآنَ لِيُقَالَ هُوَ قَارِئٌ، فَقَدْ قِيلَ ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِগ্ধ.
“আর ঐ ব্যক্তি যে ইলম শিক্ষা করেছে, অপরকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন পাঠ করেছে। তাকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তাকে জানিয়ে দেবেন তাঁর সকল নেয়ামত, ফলে সে তা জানবে। আল্লাহ বলবেন, ‘এ নেয়ামতসমূহের বিনিময়ে তুমি কি করেছ?’ সে বলবে, ‘আমি ইলম শিখেছি, অপরকে শিখিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন পাঠ করেছি।’ তিনি বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছ, তবে তুমি এ উদ্দেশ্যে ইলম শিখেছ, যেন লোকেরা তোমাকে আলেম বলে এবং এ উদ্দেশ্যে কুরআন পড়েছ, যেন লোকেরা তোমাকে কারী বলে। আর তা বলা হয়েছে।’ অতঃপর তার ব্যাপারে নির্দেশ জারি করা হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে-হিঁচড়ে অবশেষে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে”।
২. পার্থিব স্বার্থের জন্য কুরআনুল কারিম হিফয না করা: কুরআনের ভালো হাফিয ও সুললিত কারীদের মাঝে এ জাতীয় বিচ্যুতি বেশী পরিলক্ষিত হয়। অতএব তারা কুরআনুল কারিম দ্বারা পার্থিব সম্পদ, সম্মান, সাথীদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব, মানুষের প্রশংসা কুড়ানো ও নিজের দিকে মানুষদের আকৃষ্ট করার ইচ্ছা পরিহার করুন। আল্লাহ তা’আলা বলেন:
﴿مَن كَانَ يُرِيدُ حَرۡثَ ٱلۡأٓخِرَةِ نَزِدۡ لَهُۥ فِي حَرۡثِهِۦۖ وَمَن كَانَ يُرِيدُ حَرۡثَ ٱلدُّنۡيَا نُؤۡتِهِۦ مِنۡهَا وَمَا لَهُۥ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِن نَّصِيبٍ ٢٠﴾ [الشورى: ٢٠]
“যে আখিরাতের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্য তার ফসলে প্রবৃদ্ধি দান করি, আর যে দুনিয়ার ফসল কামনা করে আমি তাকে তা থেকে কিছু দেই এবং আখিরাতে তার জন্য কোনো অংশ থাকবে না”। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রمَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِيُجَارِيَ بِهِ الْعُلَمَاءَ، أَوْ لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ، أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْهِ أَدْخَلَهُ اللَّهُ النَّارَগ্ধ.
“যে ইলম অন্বেষণ করল, যেন তার দ্বারা সে আলেমদের সাথে তর্ক করতে সক্ষম হয়, অথবা তার দ্বারা মূর্খদেরকে বোকা বানাতে সক্ষম হয়, অথবা তার দ্বারা মানুষদের চেহারাকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে দাখিল করবেন”।
৩. দোয়া, ইস্তেগফার ও সকাল-সন্ধ্যার যিকরসমূহ পড়া: গুনাহ হিফযের প্রতিবন্ধক, তাই গুনাহ থেকে তওবা করা, হিফযের জন্য দোয়া করা ও সকাল-সন্ধ্যার যিকরসমূহ রীতিমত পাঠ করা কুরআনুল কারিম হিফযের জন্য সহায়ক। সকাল-সন্ধ্যার অযিফা দ্বারা আল্লাহর ইচ্ছায় শয়তান থেকে সুরক্ষা মিলে ও সময় বরকতপূর্ণ হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করার সময় বলতেন:
্রأَعُوذُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِগ্ধ.
এ দোয়া পাঠকারী সম্পর্কে শয়তান বলে, সারা দিন সে আমার থেকে নিরাপদ হয়ে গেল।
৪. একজন পরহেজগার মুয়াল্লিম নির্দিষ্ট করা ও রীতিমত হালাকায় উপস্থিত থাকা: কুরআনুল কারিম হিফয করার উদ্যোগ নেওয়ার পরবর্তী কাজ হচ্ছে একজন অভিজ্ঞ মুয়াল্লিম ঠিক করা। হিফয করার পূর্বে নির্ধারিত অংশ মুয়াল্লিমকে শুনিয়ে নিন, হিফয শেষে আবার শুনান, তাহলে আপনার হিফয নির্ভুল হবে। মুয়াল্লিম আলিম ও মুত্তাকী হলে কুরআনুল কারিমের হিফয ও তার আমল একসঙ্গে শিখা যায়। অর্থ, তাফসীর, তাকওয়া ও আনুষঙ্গিক অনেক বিষয় জানা যায়, যা হিফযের জন্য সহায়ক। যদি নির্দিষ্ট কোনো হালাকার অধীন হিফয করার সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে সেখানে রীতিমত উপস্থিত থাকা ও রুটিন মোতাবেক হিফয করা।
৫. প্রতিদিন নির্ধারিত সময় হিফয করা: হিফযের ব্রত গ্রহণকারী সর্বপ্রথম পুরো দিনের কাজ ও তার সময় বণ্টন করে নিন। অতঃপর হিফযের জন্য উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করুন ও তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করুন। হিফযের পরিমাণ কম বা বেশী যাই হোক প্রতিদিন নির্ধারিত সময় হিফয করুন। হিফযের জন্য তিনটি সময় বেশ উপযোগী: ক. ফজর সালাতের পূর্বাপর; খ. আসর সালাতের পর; ও ঘ. মাগরিব সালাতের পর।
ক. ফজর সালাতের পূর্বাপর: এশার পর দ্রুত ঘুমিয়ে ফজরের পূর্বে উঠে আল্লাহর তাওফিক মোতাবেক কয়েক রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ুন, অতঃপর জামাতের পূর্বাপর ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিট হিফয করুন। ভোর বেলার হিফয দিনের কর্মস্থলে সময়-সুযোগ মত পাঠ করুন। এ সময় হিফযকারীকে অবশ্যই এশার পর রাতের প্রথম অংশ ঘুমাতে হবে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:
্রأَنّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَكْرَهُ النَّوْمَ قَبْلَ الْعِشَاءِ وَالْحَدِيثَ بَعْدَهَاগ্ধ.
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এশার পূর্বে ঘুমানো ও তারপর কথা বলা অপছন্দ করতেন”। পাবলিক প্রতিষ্ঠানে চাকুরীরত ও ব্যবসায়ীরা এ সময় হিফয করতে পারেন।
খ. আসর সালাতের পর: স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছাত্রদের জন্য এ সময়টা বেশ উপযোগী। আসর সালাত যারা প্রথম ওয়াক্তে পড়েন-তাদের জন্য এ সময়টা খুব দীর্ঘ; আর যারা পরবর্তী সময়ে পড়েন-তারা এতে কম সময় পান, অতএব তারা আসর সালাতের পূর্বে ত্রিশ-চল্লিশ মিনিট হিফয করুন।
গ. মাগরিব সালাতের পর: হাফেযি মাদ্রাসা কিংবা বড় মাদ্রাসার অধীন হিফয শাখার ছাত্ররা এ সময় হিফয করে। শিক্ষকতা পেশায় জড়িত ও সরকারী চাকুরীজীবীরা সাধারণত এ সময় অবসর থাকেন, তারা এতে হিফয করতে পারেন।
৬. কিভাবে হিফয করবেন: হিফয শুরু করার পূর্বে নির্ধারিত অংশের তিলাওয়াত ওয়াকফসহ শিখে নিন। ‌এক-লাইনকে দু’ভাগ করা বা দু’শ্বাসে পড়ার প্রয়োজন হলে, কিংবা বড় আয়াত ছোট-ছোট অংশে ভাগ করার প্রয়োজন হলে ওয়াকফ্ করার স্থান জেনে নিন, যেন অর্থ ঠিক থাকে ও পড়া শ্রুতিমধুর হয়। প্রথম আয়াত হিফয শেষে পরবর্তী আয়াত হিফয করুন এবং উভয় আয়াত একসাথে মিলিয়ে পড়ার পদ্ধতি জেনে নিন। এভাবে হিফয পরিপক্ব হয়। ধীরেধীরে হিফয করুন, সম্ভব হলে নির্ধারিত অংশের অর্থ জেনে নিন, তাহলে হিফয দ্রুত ও দীর্ঘস্থায়ী হবে। নির্ধারিত সময়ে যতটুকু হিফয করা সম্ভব হয় তাই হিফয করুন ও তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করুন। অতিরিক্ত চাপ ত্যাগ করুন এবং নতুন হিফযের তুলনায় পুরাতন হিফযের প্রতি অধিক মনোযোগ প্রদান করুন।
হিফয করা অংশ সুন্নত, নফল ও ফরয সালাতে তিলাওয়াত করুন। শেষ রাতের সালাতে তিলাওয়াত করা অধিক উত্তম, তখন আল্লাহ স্বীয় মর্যাদা মোতাবেক দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন, আর বান্দাদের ডেকে বলেন:
্রمَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُগ্ধ.
“কে আমাকে আহ্বান করবে আমি তার ডাকে সারা দিব, কে আমার নিকট প্রার্থনা করবে আমি তাকে প্রদান করব, কে আমার নিকট ইস্তেগফার করবে আমি তাকে ক্ষমা করব”।
হিফয করা অংশ কখনো দেখে কখনো মুখস্থ পড়ুন, সর্বদা দেখে পড়া হিফযের জন্য ক্ষতিকর, অনুরূপ সর্বদা মুখস্থ পড়া হিফয ও শুদ্ধতার জন্য বিপজ্জনক। কুরআনুল কারিমের প্রতি অধিক দৃষ্টি হিফযকে দৃঢ় করে, মনোযোগে গভীরতা আনে ও আয়াতের সাথে আন্দোলিত হতে সাহায্য করে, তাই চিন্তা ও গবেষণার উদ্দেশ্যে দেখে-দেখে কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করুন। আবার হিফযকে যাচাই ও নজরদারী করার জন্য মুখস্থ পড়ুন।
৭. নেককার প্রতিযোগী গ্রহণ করা: কুরআনুল কারিম হিফয করার জন্য নেককার প্রতিযোগী গ্রহণ করুন। হিফযের ক্ষেত্রে সহপাঠী কেউ থাকলে দু’জনের মাঝে সুন্দর প্রতিযোগিতা গড়ে উঠে, হিফযের সাহস ও স্পৃহা বৃদ্ধি পায় এবং সর্বদা মনে পড়ে যে, এ কল্যাণের ক্ষেত্রে আমার সাথী আমাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
৮. পিছনের পড়ার প্রতি যতœ নিন:
কুরআনুল কারিম খুব দ্রুত হিফয হয়, কিন্তু রীতিমত তিলাওয়াত না করলে দ্রুত ভুলিয়ে দেওয়া হয়। ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেক বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রإنَّمَا مَثَلُ صَاحِبِ الْقُرْآنِ كَمَثَلِ الإِبِلِ المُعَقَّلَةِ، إِنْ عَاهَدَ عَلَيْهَا أَمْسَكَهَا، وَإِنْ أَطْلَقَهَا ذَهَبَتْগ্ধ. متفقٌ عَلَيْهِগ্ধ.
“নিশ্চয় কুরআনের ধারকের উদাহরণ বাঁধা উটের উদাহরণের ন্যায়, যদি সে তাকে বেঁধে রাখে আটকে রাখবে, আর তাকে ছেড়ে দিলে সে চলে যাবে।” মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, মুসা ইবনে উকবাহ অত্র হাদিস শেষে অতিরিক্ত বর্ণনা করেন:
্রوَإِذَا قَامَ صَاحِبُ الْقُرْآنِ فَقَرَأَهُ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ ذَكَرَهُ، وَإِذَا لَمْ يَقُمْ بِهِ نَسِيَهُগ্ধ.
“কুরআনুল কারিমের ধারক যদি (কুরআন নিয়ে) কিয়াম করে, অতঃপর দিন-রাত তা তিলাওয়াত করে, তাহলে কুরআন স্মরণ রাখবে, আর যদি কুরআন নিয়ে কিয়াম না করে তা ভুলে যাবে”।
পিছনের হিফয দৃঢ় করে সামনে মুখস্থ করুন। প্রতিদিন হিফযের জন্য যে সময় নির্ধারিত থাকবে, অল্প হলেও তাতে পিছনের পড়ার রুটিন রাখুন। হিফযের পরিমাণ বেশী হলে কখনো নতুন হিফয বন্ধ করে পিছনের হিফয মজবুত করুন। এতে ঢিলেমি না করা, কারণ পিছনের পড়া মুখস্থ না থাকলে হিফযের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হয়। আবার এ ইচ্ছাও না করা যে, সবক শেষ করে পরবর্তীতে হিফয মজবুত করব, এ জাতীয় ইচ্ছা সাধারণত পূরণ হয় না।
৯. কুরআনুল কারিম শিক্ষার্থীর কতিপয় গুণগান: পোশাক, শরীর ও মুখমণ্ডল পরিষ্কার রাখা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, মুয়াল্লিম ও সহপাঠীদের সাথে বিনয়ী ও সহনশীল হওয়া, তাদের সাথে আদব রক্ষা করা। মুয়াল্লিমের সামনে উঁচু সরে কথা না বলা, যদিও তার বয়স কম হয়। অধিক হাসাহাসি ও খেলা-ধুলা ত্যাগ করা, তবে হাসি-খুশি থাকা, যেন তার প্রতি মুয়াল্লিমের মহব্বত সৃষ্টি হয়।
মুয়াল্লিম থেকে কখনো কঠোর আচরণ প্রকাশ পেলে তাকে পরিহার না করা, আদব রক্ষা করা ও পড়া-শুনার প্রতি আগ্রহী থাকা। কুরআন পবিত্র বীজের ন্যায়, যা উর্বর ও পরিচ্ছন্ন জমি ব্যতীত গজায় না, তাই কুরআনুল কারিম হিফযের জন্য হিংসা ও কপটতা মুক্ত পবিত্র অন্তর থাকা চাই। হিংসা করার অর্থ আল্লাহর তকদীরে আপত্তি করা। আবার কারো হিংসার পাত্র হতে নেই, কারণ চোখেরও হক আছে। অতএব বদ-নজর থেকে সুরক্ষা ও ইখলাস ধরে রাখার স্বার্থে আপনার হিফয গোপন রাখুন। সৎ ও মহৎ চরিত্রগুণে গুণান্বিত হোন, অহংকার ও অহমিকা থেকে মুক্ত থাকুন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
্রوَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُগ্ধ.
“আল্লাহর জন্য কেউ বিনয়ী হয়নি তবে অবশ্যই আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন”।
১০. নির্দিষ্ট ছাপার কুরআন পড়া: হিফযের শিক্ষার্থীদের অবশ্যই নির্দিষ্ট ছাপার কুরআন তথা হাফেযি কুরআন পড়া জরুরি। কারণ স্মৃতি শক্তির ন্যায় চোখও হিফয করে, তাই হাফেযি কুরআন পড়লে সূরা ও আয়াতের অবস্থান মনে থাকে, প্রয়োজনের সময় নির্দিষ্ট স্থান থেকে নির্দিষ্ট আয়াত খোঁজে নেওয়া সহজ হয়।

হাফেযি কুরআন পরিচিতি
আমাদের দেশে দু’ধরণের হাফেযি কুরআন রয়েছে: দেশীয় ছাপা ও সৌদি ছাপা। উভয় ছাপায় তিনটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান: ক. পৃষ্ঠার শুরু থেকে আয়াতের শুরু এবং পৃষ্ঠার শেষে আয়াতও শেষ; খ. প্রতি পৃষ্ঠায় ১৫-টি লাইন; গ. বিশ পৃষ্ঠায় এক পারা।
প্রত্যেক হাফেযি কুরআনুল কারিমে এ তিনটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। তবে কিছু পার্থক্যও রয়েছে, যেমন দেশী ছাপার হাফেযি কুরআনে সূরা ফাতেহা থেকে সূরা নাস পর্যন্ত ৬১০ পৃষ্ঠা, আর সৌদি ছাপার হাফেযি কুরআনে ৬০৪ পৃষ্ঠা, মাত্র ৬-পৃষ্ঠার ব্যবধান। কারণ দেশীয় ছাপার হাফেযি কুরআনে ২৯ ও ৩০-তম পারায় যথাক্রমে ২৪ ও ২৫ পৃষ্ঠা, আর সৌদি ছাপার হাফেযি কুরআনে ২৯ ও ৩০তম পারায় যথাক্রমে ২০ ও ২৩ পৃষ্ঠা। এভাবে মোট ছয় পৃষ্ঠার তফাৎ সৃষ্টি হয়েছে।
দ্বিতীয় আরেকটি পার্থক্য হচ্ছে, উভয় ছাপার হাফেযি মুসহাফের সকল পৃষ্ঠায় আয়াত সংখ্যা সমান নয়, যেমন আমাদের দেশীয় ছাপার হাফেযি কুরআনে সূরা বাকারার প্রথম পৃষ্ঠায় রয়েছে ১-৪টি আয়াত, কিন্তু সৌদি ছাপার হাফেযি কুরআনে ১-৫টি আয়াত। অনুরূপ প্রত্যেক ছাপার হাফেযি কুরআনে সকল সূরার শুরু ও শেষ এক জায়গায় থেকে হয়নি, যেমন আমাদের দেশীয় ছাপায় সূরা হিজর শুরু হয়েছে ১৩নং পারা থেকে, কিন্তু সৌদি ছাপার হাফেযি কুরআনে সূরা হিজর শুরু হয়েছে ১৪নং পারা থেকে। আবার সূরা কাহাফের সর্বশেষ আয়াত দেখুন আমাদের দেশীয় ছাপার হাফেযি কুরআনের ১৬নং পারার ৪নং পৃষ্ঠার প্রথম দু’লাইনে; কিন্তু সৌদি ছাপার ১৬নং পারার ৩নং পৃষ্ঠার সর্বশেষ দু’লাইনে, তবে মৌলিক তিনটি বৈশিষ্ট্য সব হাফেযি কুরআনেই বিদ্যমান।
যার নিকট যে ছাপা সহজলভ্য, তার সেটা পড়া সমীচীন, যেন বাড়ি-সফর ও মসজিদ সর্বত্র এক ছাপার কুরআন পড়া সম্ভব হয়, তাহলে হিফয পরিপক্ব ও মজবুত হবে, সূরা-পারা ও আয়াতের অবস্থান স্মরণ থাকবে। তরজমা বা তাফসীর পড়ার ক্ষেত্রে হাফিয সাহেবগণ হাফেযি ছাপার তরজমা-তাফসীরকে প্রাধান্য দিবেন। যাদের নিকট সৌদি ছাপার কুরআন সহজলভ্য নয়, তারা নিঃসংকোচে হিফযের জন্য দেশীয় হাফেযি কুরআন পড়ুন। কখনো দেশী ছাপা কখনো বিদেশী ছাপার কুরআন পড়া হিফযকে দুর্বল করে, যদি তাতে আয়াতের অবস্থান বিভিন্ন হয়।
কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের কারণে সৌদি ছাপার হাফেযি কুরআন দ্বারা হিফয করা উত্তম। ১. সৌদি ছাপায় পৃষ্ঠা সমাপ্তির সাথে বিষয় বস্তু সমাপ্তির প্রতি যথাসম্ভব চেষ্টা করা হয়েছে। উদাহরণত সূরা বাকারার পঞ্চম আয়াতের সম্পর্ক পূর্বের চারটি আয়াতের আলোচ্য বিষয় মুত্তাকীদের সাথে, ষষ্ঠ আয়াত থেকে কাফেরদের আলোচনা শুরু হয়েছে। সৌদি ছাপায় পৃষ্ঠা সমাপ্তির সাথে বিষয় বস্তু সমাপ্ত হয়েছে, নতুন পৃষ্ঠা থেকে নতুন বিষয়ের সূচনা, পক্ষান্তরে আমাদের দেশীয় ছাপায় বিনা প্রয়োজনে একটি বিষয়কে দু’পৃষ্ঠায় ভাগ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে পৃষ্ঠা শেষে তিলাওয়াত শেষ করা, কিংবা পৃষ্ঠা শেষে রুকু করা একটি বিষয়কে বিচ্ছিন্ন করার শামিল। ২. সৌদি ছাপায় যথাসম্ভব চেষ্টা করা হয়েছে যেন পৃষ্ঠা শেষে সূরা হয় এবং পৃষ্ঠা শুরুর সাথে সূরা কিংবা পারা শুরু হয়, উদাহরণত সূরা হিজর ও সূরা কাহাফকে দেখুন; পক্ষান্তরে আমাদের দেশীয় ছাপায় সূরা হিজরের দ্বিতীয় আয়াত থেকে পৃষ্ঠা ও পারা উভয় শুরু এবং সূরা কাহাফের শেষ আয়াত দ্বারা পৃষ্ঠা শুরু, যা রীতিমত দৃষ্টিকটু ও রুচিবিরুদ্ধ। ৩. সৌদি ছাপার কুরআনে সূরা শুরুতে মাক্কী, মাদানী ও আয়াত সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি, কারণ আমাদের আদর্শ পূর্বপুরুষগণ কুরআনকে গায়রে কুরআন থেকে পৃথক করার উপর ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন। দ্বিতীয়ত কতিপয় সূরার ব্যাপারে মাক্কী বা মাদানী অকাট্য সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব হয়নি, পক্ষান্তরে আমাদের দেশীয় কুরআনে মাক্কী-মাদানীসহ আয়াত সংখ্যাও লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যা আদর্শ মনীষীদের নীতি বিরুদ্ধ সন্দেহ নেই। ৪. সৌদি ছাপার কুরআন আরবি ভাষার সঠিক নীতিমালা অনুসরণ করে লিখা, আমাদের দেশীয় ছাপার ক্ষেত্রে যার অনুসরণ করা হয়নি, যেমন আলিফের পর একটি উহ্য আলিফকে বুঝানোর জন্য আমাদের দেশীয় ছাপায় লিখা হয় آمنوا অথচ বিশুদ্ধ পদ্ধতি হচ্ছে ءامنوا লিখা।
আমাদের দেশের হাফেয সাহেবগণ পৃষ্ঠা হিসেবে মুখস্থ করেন, তাই তারা আয়াত শুনে পারা-পৃষ্ঠা দক্ষতার সাথে বলতে পারেন, কিন্তু আয়াত ও রুকু নাম্বার কদাচিৎ ছাড়া বলতে পারেন না। তাদের এ অভ্যাসের প্রভাব সালাতেও পড়ে, বিশেষ করে তারাবির সালাতে। তাতে তারা পৃষ্ঠা হিসাবে তিলাওয়াত করেন, বিধায় অনেক সময় অর্থ ও বিষয় বস্তু ঠিক থাকে না। তাই তাদের তিলাওয়াত শুনে অর্থ-জানা মুসল্লিরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না, ভারত-পাকিস্তানের হাফেযগণ পড়েন রুকু হিসেবে। তারা আয়াত শুনে সূরা ও রুকুর নাম্বার দক্ষতার সাথে বলতে পারেন। আরববিশ্ব, বিশেষ করে সৌদি আরবের হাফেযগণ অর্থ জানেন এবং নির্দিষ্ট ছাপার কুরআন পড়েন বিধায় পৃষ্ঠার নাম্বার ঠিকঠিক বলতে পারেন এবং আয়াতের বিষয়-বস্তুও ঠিক রাখতে সক্ষম হন।